সফলতার গল্প — ১০১ : মোঃ শাহাদাত হোসেন

shahadath_hossain
Sending
User Review
5 (8 votes)

মোঃ শাহাদাত হোসেন, এক স্বপ্নবাজ তরুন

মেন্টর, চীফ অপারেটিং অফিসার (COO), UY Lab; প্রতিষ্ঠাতা- টেমপ্লেট সেলার, ফ্রিল্যান্স গ্রাফিক ডিজাইনার।


 

১। আপনি নিজেকে কী হিসেবে পরিচয় দিতে ভালোবাসেন?

 মোঃ শাহাদাত হোসেনঃ মেন্টর, উদ্যোক্তা এবং চীফ অপারেটিং অফিসার (COO), UY Lab।

  

২। এতগুলো কাজ ম্যানেজ করেন কীভাবে? 

মোঃ শাহাদাত হোসেনঃ প্রথমেই আমি আমার কাজগুলোকে দুইভাগে ভাগ করে ফেলি। অফিসের কাজ এবং ব্যক্তিগত কাজ। আগামীকাল কী কাজ করতে হবে, সেগুলোর জন্য আমি আজ রাতেই টাস্কলিস্ট তৈরি করে রাখি।

দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিগত কাজগুলো সবসময় অফিসের কাজের পর অবসর সময়ে করি। এরসাথে নতুন কোন কাজ শুরুর প্ল্যানিংও করি।

  

৩। ফ্রিল্যান্সিংয়ে হাতেখড়ি কীভাবে হয়েছিল? 

মোঃ শাহাদাত হোসেনঃ মূলত ২০০৯ সালে ফ্রিল্যান্সিংয়ে আমার যাত্রা শুরু হয়েছে। একসময় ফ্রিল্যান্সারই আমার মূল পরিচয় ছিল। এখন অনেকগুলো পেশায় জড়িয়ে যাওয়াতে ফ্রিল্যান্সার পরিচয়টা নেই।

প্রথমত, আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল কম্পিউটার গেমিংয়ের মাধ্যমে। আমি প্রচুর গেম খেলতাম, এই গেম খেলতে খেলতে কম্পিউটার সম্পর্কে ভালো ধারণা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, প্রথমআলো পত্রিকায় “কম্পিউটার প্রতিদিন” নামে প্রতিদিন একটি কলাম বের হত। সেটা আমি কেটে কেটে রাখতাম এবং কাজ শিখতাম। অনলাইনে আমার ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল oDesk দিয়ে, বর্তমানে এটির  নাম Upworkকম্পিউটার প্রতিদিন কলামের মাধ্যমেই আমি oDesk সম্পর্কে জানতে পারি। এভাবেই ফ্রিল্যান্সিংয়ে আমার যাত্রা শুরু হয়।

এছাড়াও, প্রতিনিয়তই বিভিন্ন টিউটোরিয়াল দেখে, ব্লগ পড়ে, এবং ওয়েবসাইট ব্রাউজ করে কাজ শিখেছি।

 

৪। এত পেশা থাকতে, এই পেশাতেই কেন এসেছিলেন? 

মোঃ শাহাদাত হোসেনঃ আমি আগেই বলেছি, আমি এই পেশাতে এসেছি ২০০৯ সালে। তখন আমি অনার্সে পড়ি। পড়াশোনার পাশাপাশি কোন চাকুরী করা বা পাওয়া দুটোই প্রায় অসম্ভব। পড়াশোনা করার পর অবসর সময়কে টেকনোলজী ব্যবহার করে কীভাবে কাজে লাগাতে পারি, এই বিষয়টা মাথায় আসে। এই চিন্তা থেকেই আমি ফ্রিল্যান্সিংয়ে ফোকাস হই।

 

 ৫। এ পেশায় সফল হবার আগে হতাশা ছিল কি? কীভাবে কাটিয়েছেন? 

মোঃ শাহাদাত হোসেনঃ হ্যাঁ ছিল। বিভিন্ন মার্কেটপ্লেসে কাজের জন্য বিড করা, এপ্লাই করা, এবং রেসপন্স না পাওয়ায় প্রায় এক বছর হতাশায় ছিলাম। হতাশার ব্যাপারটা এমন ছিল যে, ৩-৪ মাস খুব মনোযোগ দিয়ে কাজ করতাম। এই সময়ে যখন সফলতা আসত না, তখন ১-১.৫ মাস হতাশায় কাটত। মনে হত যে, ফ্রিল্যান্সিংয়ের সব কিছু মিথ্যা।

আর ঐ সময় আইটি প্রতিষ্ঠান বা মোটিভেশন দেয়ার মত কেউ না থাকায়, নিজেই নিজেকে মোটিভেট করতাম। অনেক সময়  চিন্তা করতাম যে, নেটে আমি কাজ পাচ্ছি না, তাহলে হয়ত জায়গাটা খারাপ।

আবার পরক্ষণেই এটাও ভাবতাম, যেহেতু US, UK, India, Pakistan থেকে অনেক ফ্রিল্যান্সার কাজ করছে, সেহেতু ফ্রিল্যান্সিংয়ের সব কিছু মিথ্যা না। আর যদি সব কিছু মিথ্যা না হয়, তাহলে সমস্যা নিশ্চয় আমার মধ্যে।

আমিতো বসেই আছি, মুভি দেখছি বা গেম খেলছি তাহলে আরও একবার চেষ্টা করে দেখি। এভাবেই আমি নিজেকে মোটিভেটেড রাখতাম।

 

shahadat-hossain-on-meeting

 

৬। আপনার টিম মেম্বারদের কিভাবে অনুপ্রেরণা দেন? 

মোঃ শাহাদাত হোসেনঃ আমার কাজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। একটা নির্দিষ্ট সময় পর পর মিটিং করি এবং টিম মেম্বারদের কাজ করতে কোথায় সমস্যা হচ্ছে তা বের করি। বিভিন্ন সময় কাজ করতে গিয়ে প্রবলেমে পড়েছি এবং সেটা কীভাবে সমাধান করেছি, এগুলো শেয়ার করি।

একটা মানুষ কাজ করতে করতে একঘেয়ে হয়ে পড়ে। এই একঘেয়েমি দূর করতে তার অনুপ্রেরণা প্রয়োজন হয়। এই অনুপ্রেরণাগুলো দেয়ার চেষ্টা করি। অর্থাৎ টিমকে মোটিভেটেড রাখতে যা কিছু করার দরকার, সবই করার চেষ্টা করি।

এছাড়াও, ছোট ছোট টার্গেট সেট করা এবং ব্যক্তিগতভাবে সবার মতামত/সমস্যা শোনার চেষ্টা করি।

 

৭। টাইম ম্যানেজমেন্টের জন্য আপনার পছন্দের টুল/এপ্লিকেশন যা ছাড়া আপনি কাজ করতে পারেন না? 

মোঃ শাহাদাত হোসেনঃ আমি আমার নিজের টুল Task Management System ব্যবহার করি। এছাড়াও ফ্রি অনেক টুল আছে। যেমন Trello, Asana । এগুলোও বেশ ভালো, আবার কেউ চাইলে আমার মত নিজস্ব Task Management System ব্যবহার করতে পারে।

 

৮। আপনার করা কোন কাজটির জন্য গর্ববোধ করেন? 

মোঃ শাহাদাত হোসেনঃ আমার কয়েকটি কাজ রয়েছে যেগুলোর জন্য গর্ববোধ হয়। সাম্প্রতিক সময়ে National ICT Award 2018 প্রাপ্তি এবং Asia Pacific ICT Alliance (APICTA ) এ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনয়ন প্রাপ্তি।

আবার আমি মেন্টর হিসেবেও অনেকদিন ধরে কাজ করছি। যখন আমার ছাত্র/ছাত্রীদের সাফল্য দেখি তখনও খুব গর্ববোধ হয়।

success-story-shahadath-hossain
ডাক এবং টেলিযোগাযোগ মন্ত্রনালয়ের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী জনাব জুনাইদ আহমেদ পলকের হাত থেকে বেসিস ন্যাশনাল আইসিটি আ্যাওয়ার্ড ২০১৮ নিচ্ছেন মোঃ শাহাদাত হোসেন

 

 ৯। আপনার সবচেয়ে বড় অর্জন কোনটি? 

মোঃ শাহাদাত হোসেনঃ আমার নিজস্ব মার্কেটপ্লেস Template Saler এর জন্য APICTA Award-এ মনোনয়ন প্রাপ্তিটা আমার সবচেয়ে বড় অর্জন।

  

১০। আপনার তো ব্যক্তিগত ব্লগসাইট এবং মার্কেটপ্লেস আছে ডোমেইন হোস্টিং সম্পর্কে আপনার অনেক অভিজ্ঞতা আছে অনেকেই আমাদের কাছে ভালো ডোমেইন হোস্টিং সার্ভিস প্রোভাইডার সম্পর্কে জানতে চায় আপনার মতে ভালো ডোমেইন হোস্টিং সার্ভিস প্রোভাইডার কোনটি? 

মোঃ শাহাদাত হোসেনঃ আমি Amazon এবং Digital Ocean কে পছন্দ করি। অন্য প্রোভাইডারের তুলনায় আমার কাছে এই দুটির সার্ভিস অনেক ভাল মনে হয়েছে। সাইট যখন বড় হয়, ভিজিটর বেশি হয় অথবা সাইটে অনেক এপ্লিকেশন ব্যবহার করা হয়, তখন সাইট একটু স্লো হয়ে যায়। আমি Amazon এবং Digital Ocean দিয়ে এ ধরণের সমস্যায় পড়ি নি।

 

success-story-shahadath-hossain
বেসিস ন্যাশনাল আইসিটি আ্যাওয়ার্ড ২০১৮ হাতে মোঃ শাহাদাত হোসেন

 

১১। আপনি তো National ICT Award 2018 পুরস্কার পেয়েছেন এই প্রজেক্টে কাজ করার সময় কে কে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা বা অনুপ্রেরণা দিয়েছিল? 

মোঃ শাহাদাত হোসেনঃ এই প্রজেক্টে অনেক বড় একটা টিম কাজ করেছে। এখানকার সবাই অনেক হেল্পফুল ছিল। আসলে আমরা সবাই একে অপরকে সাহায্য সহযোগিতা করেছি।

তবে যদি একজনের নাম বলতে হয়, তাহলে আমি আমার টিমের ডেভেলপমেন্ট সেকশনের মোঃ মাহফুজ আলমের নাম বলব। উনি আইডিয়া ইম্প্লিমেন্টেশনে উৎসাহ দেয়া, ডেভেলপমেন্ট সাপোর্ট দেয়া এই সবকিছু করেছেন।

 

১২। আপনি তো একজন ভালো গ্রফিক ডিজাইনার নতুন যারা গ্রাফিক ডিজাইনিং পেশায় আসতে ইচ্ছুক, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী? 

মোঃ শাহাদাত হোসেনঃ গ্রাফিক ডিজাইন মজার একটি পেশা। এখানে জানার এবং শেখার অনেক কিছু আছে। কেউ যদি এ পেশাটাকে প্যাশন হিসেবে নেয়, তাহলে অনেক দূর যাওয়া সম্ভব।

আর গ্রাফিক ডিজাইন ইন্ডাস্ট্রিটা অনেক বড়, তাই এখানে অনেক কিছু শেখার আছে, অনেক আর্ন করা যায়। তবে এই পেশাটাকে প্যাশন হিসেবে নিতে হবে।

 

success-story-shahadath-hossain
বেসিস ন্যাশনাল আইসিটি অ্যাওয়ার্ডস ২০১৮ অনুষ্ঠান শেষে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রনালয়ের মাননীয় মন্ত্রী জনাব মোস্তাফা জব্বার ও বেসিস সভাপতি ফারহানা এ রহমানের সাথে মোঃ শাহাদাত হোসেন

 

১৩। গ্রাফিক ডিজাইনিং পেশায় সফল হতে কোন ব্যক্তি/ব্লগ অনুসরণ করা উচিত বলে মনে করেন? 

 মোঃ শাহাদাত হোসেনঃ    ১। Lynda থেকে আমি অনেক টিউটোরিয়াল দেখে কাজ শিখেছি।

২। Creative Bloq পড়েছি।

৩। Behance থেকে আমার ডিজাইন আইডিয়া উন্নত করেছি।

 

১৪। সারাদিনে কত ঘন্টা কাজ করেন? 

মোঃ শাহাদাত হোসেনঃ অফিস এবং ব্যক্তিগত কাজ মিলিয়ে সারাদিনে ১৩ ঘন্টা বিভিন্ন কাজের সাথে যুক্ত থাকি।

 

১৫। আগামী বছরের ভবিষ্যত পরিকল্পনা কী? 

মোঃ শাহাদাত হোসেনঃ প্রথমত, যে কাজগুলো শুরু করেছি সেগুলোকে সফল করা। দ্বিতীয়ত, আমার প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশের প্রথম ৩টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দেখতে চাই।

 

১৬। বর্তমান প্রজন্মের তরুনদের কোন জিনিসটি পছন্দ করেন? 

মোঃ শাহাদাত হোসেনঃ বর্তমান প্রজন্মের তরুনদের কাজ করার আগ্রহ আমার খুব ভালো লাগে। তারা বসে থাকতে চায় না। তারা তাদের সময়কে কোন না কোনভাবে কাজে লাগিয়ে আউটপুট বের করতে চাচ্ছে। তারা যদি এই আউটপুটটা স্মার্টলি ব্যবহার করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়ে যাবে।

 

১৭। হতাশাগ্রস্ত কিংবা শিক্ষিত বেকার তরুনদের উদ্দেশ্যে আপনার উপদেশ কী? 

মোঃ শাহাদাত হোসেনঃ হতাশা আসবেই। সব মানুষই কোন না কোন সময় হাতাশ হয়। জীবনে হতাশা আসবে আবার চলেও যাবে। প্রতিটা কাজেই সমস্যা আসবে, আবার সমস্যার সমাধানের রাস্তাও বের হবে। তাহলে আমি কেন সমস্যার জন্য হতাশ হয়ে বসে থাকব। বরং ঐ সময় আমি সমস্যা সমাধানের কাজ করব।

 

১৮। অবসর সময়ে কী করেন? 

মোঃ শাহাদাত হোসেনঃ অবসরে আমি ঘুরতে পছন্দ করি।

  

১৯। আপনার পড়া কোন বই, ব্লগ, দেখা মুভি যা সবার পড়া/দেখা উচিত? 

মোঃ শাহাদাত হোসেনঃ মুভির মধ্যে “3 Idiots” মুভিটা অনেক ভাল লাগে। বইয়ের মধ্যে “তুমিও জিতবে” আর “ডেল কার্নেগী সমগ্র”। প্রথমদিকে আমি “Tech Tunes” ব্লগটা অনেক ফলো করতাম।

 

২০। টেক যুব সম্পর্কে আপনার অভিব্যক্তি 

মোঃ শাহাদাত হোসেনঃ প্রতিটা পরিকল্পনা বা যাত্রা শুরু হয় ভাল কিছুর জন্য, এটা আমি বিশ্বাস করি। আমাদের দেশের যুব সমাজের অনেক বড় একটা অংশ বেকার। ছোট ছোট ট্রিকস এবং টিপসের মাধ্যমে টেক যুব যুব সমাজকে ফ্রিল্যান্সিংয়ে উদ্বুদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে। এটা অবশ্যই একটা ভালো উদ্যোগ। যদি একটা যুবকেরও স্কিল ডেভেলপ হয় বা ক্যারিয়ারের উন্নতি হয়, তাহলে টেকযুব’র স্বার্থকতা সেখানেই।

আমি মনে করি টেক যুব যদি তাদের এই লক্ষ্য ধরে রাখতে পারে, তাহলে তারা সফল হবেই।

 

সাক্ষাতকার দেয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আমরা আশা করছি আপনার এই সাক্ষাতকার অসংখ্য তরুন-তরুনীকে জীবন যুদ্ধে অনুপ্রাণিত করবে

Facebook Comments

1 Thought to “সফলতার গল্প — ১০১ : মোঃ শাহাদাত হোসেন”

  1. শাহাদাত ভাই এই কথা গুলো জানতে পেরে অনেক উপকৃত হলাম। পাশাপাশি অনেক কিছু জানতে পারলাম। অনেক সময় হতাশা কাজ করে এবং উনি বলেছেন কিভাবে উনি হতাশাকে জয় করতেন। ধন্যবাদ সাক্ষাৎকার টি শেয়ার করার জন্য।

Leave a Comment